Monday, 4 August 2014

প্রকৃত আলেম

اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ وَمِنَ الْأَرْضِ مِثْلَهُنَّ يَتَنَزَّلُ الْأَمْرُ بَيْنَهُنَّ لِتَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ وَأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَاطَ بِكُلِّ شَيْءٍ عِلْمًا [٦٥:١٢]
আল্লাহ সপ্তাকাশ সৃষ্টি করেছেন এবং পৃথিবীও সেই পরিমাণে, এসবের মধ্যে তাঁর আদেশ অবতীর্ণ হয়, যাতে তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং সবকিছু তাঁর গোচরীভূত।


যখন তাদেরকে বলা হয় যে, আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান এবং রসূলের দিকে এস, তখন তারা বলে, আমাদের জন্যে তাই যথেষ্ট, যার উপর আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে পেয়েছি। যদি তাদের বাপ দাদারা কোন জ্ঞান না রাখে এবং হেদায়েত প্রাপ্ত না হয় তবুও কি তারা তাই করবে? (৫: ১০৪)

আলেম শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। শাব্দিক অর্থ হচ্ছে জান্তা, জ্ঞানী ইত্যাদি। সাধারণত আমরা মাদ্রাসায় পড়ুয়াদেরকে আলেম বলে অভিহিত করি। এঁদের মধ্যে যাঁরা বা যিনি ইলমে ছরফ, নাহু, ফিকাহ, হাদিস কিংবা তাফসীর শাস্ত্রে অধিক পান্ডিত্যের অধিকারী, আমরা তাঁকে বা তাঁদেরকে বড় আলেম বলে মান্য করে থাকি। আবার তাঁদের মধ্য হতে লম্বা কোর্তা পরিহিত শ্মশ্রু মন্ডিত এবং উষ্ণীশধারীদেরকে আমরা আলেমে বাআমল হিসেবে আখ্যায়িত করে থাকি এবং তাঁদেরকে প্রকৃত আলেম হিসেবে গণ্য করে শ্রদ্ধার চোখে দেখি। আসলে কি ব্যাপারটা এরূপ? আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) এর দৃষ্টিতে প্রকৃত আলেম কি এমন? এ সম্পর্কে কিঞ্চিত আলোচনা করার পূর্বে ইলেম সম্পর্কে জানতে হবে। ইলম শব্দের অর্থ হচ্ছে জানা, অবহিত হওয়া। কিন্তু কেবল জানা আর অবহিত হওয়ার নাম ইলেম নয়। বরং ইলম হচ্ছে আল্লাহ্ প্রদত্ত মুমীনের অন্তরে প্রতিস্থাপিত একটি জ্যোতি, যা নাকি নবুয়াতের জ্যোর্তিমালা থেকে আহরিত এবং মুহাম্মদ (সাঃ) এর বাণী, কাজ এবং তাঁর প্রশংসিত অবস্থাসমূহ হতে চয়নকৃত। যে জ্যোতি দ্বারা মুমীন মহান আল্লাহ্ তাআলার জাত, সীফাত ইত্যাদির প্রতি আকৃষ্ট হন এবং সে পথে পরিচালিত হন।

তা’হলে বুঝা যাচ্ছে, আল্লাহ্র নূরে নূরান্বিত অন্তরাত্মার অধিকারী মুমীনই হচ্ছে প্রকৃত আলেম। আর যে হৃদয় আল্লাহ্র নূরে আলোকিত, সে হৃদয় আল্লাহ্র প্রেমে সিক্ত এবং আল্লাহ্র ভয়ে ভীত সম্ভ্রস্ত। সুতরাং সে মুমীন ব্যক্তিই প্রকৃত আলেম, যে গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহ্কে ভয় করে, আল্লাহ্র পছন্দনীয় বিষয় গ্রহণ করে এবং আল্লাহ্র অপছন্দনীয় বিষয়কে সে ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করে। ইলেম অনুয়ায়ী যাঁরা আমল করেন, তাঁদেরকেই বলা হয় প্রকৃত আলেম। প্রকৃত আলেমের পরিচয় নিম্নোক্ত হাদীসটিতে বিধৃত হয়েছে। হাদীসটি এরূপ :

হযরত সুফিয়ান ছাওরী (রহ.) হতে বর্ণিত যে, একদা হযরত ওমর (রাঃ) আকাবিরে তাবেয়ীনদের অন্যতম হযরত কাবেআহবার (রাহ.) কে জিজ্ঞেস করলেন- সাহেবে ইলম বা প্রকৃত আলেম কাঁরা? প্রত্যুত্তরে হযরত কা’ব (রাহ.) বললেন- সাহেবে ইলেম বা প্রকৃত আলেম তাঁরা যাঁরা স্ব-স্ব উপার্জিত ইলম অনুযায়ী আমলও করেন। পুনরায় হযরত ওমর (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন- কোন বস্ত্ত আলেমদের অন্তর হতে ইলম (ইলমের আলো-বরকত) কে বের করে দেয়? উত্তরে হযরত কা’ব বললেন- (পার্থিব) লোভ-লালসা (আলেমদের অন্তর হতে) ইলমকে বের করে দিয়।

(দারামী)- মিশকাত।

ইলমের আলো ও বরকত এর বিশ্লেষণ প্রসঙ্গে মুহাদ্দিসীনরা বলেছেন যে আল্লাহ্ ভীতি, আখিরাতের প্রস্ত্ততি ও জাতির হেদায়াতের চিন্তা-ফিকিরে মগ্ন থাকা হচ্ছে আলো ও বরকত। অন্তরে যখন দুনিয়ার প্রতি লোভ লালসা সৃষ্টি হয়, তখন অন্তরে আর ইলমের ঐ নূর ও বরকত বাকী থাকেনা। অন্তর হয়ে পড়ে তিমিরাচ্ছন্ন। কেননা অন্তরে লোভ-লালসা আর কামনা বাসনা সৃষ্টি হলে নানা প্রকার পার্থিব বিলাস সামগ্রী ও আর্থিক জৌলুস লাভ করতে সে মরিয়া হয়ে উঠে। ধন-সম্পদের মোহে সে ইলমকে লাঞ্ছনার অন্ধকূপে নিপতিত করে দেয়। দুনিয়াদার ফাসেক ফুজ্জারের মন জয় করতে সারাক্ষণ ব্যতিব্যস্ত থাকে। পদ মার্যাদার লোভে সে তাঁর স্বকীয়াতা ভুলে যায়। তার মধ্যে ‘রিয়া’ আর’সুমআ’র ভূত চেপে বসে। কারণ তার অন্তরতো আলো শূন্য। যুগের শ্রেষ্ঠ নামী-দামী আলেম হলেও তাকে বা তাদেরকে প্রকৃত আলেম বলা চলেনা। এ’ সম্পর্কে হযরত যাননুন মিসরীর বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন-

‘‘আমরা আমাদের পূর্ববর্তীদের দেখেছি, যখন তাঁরা ইলমের মধ্যে বেড়ে যেতেন (অর্থাৎ বড় আলেম হতেন), দুনিয়ার প্রতি তাঁরা ছিলেন উদাসীন। এর প্রতি তাঁদের উদাস মনোভাব বেড়ে যেত। পার্থিব উপায় উপকরণ এবং চাকচিক্যের প্রতি মোহ হ্রাস পেত। কিন্তু আজকাল দেখছি, কোন ব্যক্তি ইলমের মধ্যে যে পরিমাণ বাড়তে থাকে, ঠিক সে পরিমাণ পার্থিব জৌলুসের প্রতিও অধিক অনুরক্ত হয়ে পড়ে। সম্পদ-সম্পত্তির আধিক্যের প্রত্যাশায় মোহগ্রস্থ হয়ে পড়ে। এ’ভাবে সে বড় আলেমও বনে যায়। কিন্তু তার অন্তরে ইলমের সামান্যতম আলোও অবশিষ্ট থাকেনা।

একটু চিন্তা করলে প্রতিয়মান হয় যে, আজকের এ’সময়ের কিছুকিছু বড় আলেমের দাপাদাপি সর্বত্রই বিরাজমান। গাড়ি-বাড়ি এপার্টমেন্ট, বিলাস-বহুল যান্ত্রিক সরঞ্জামাদি জোগাড়ে সারাক্ষণ পেরেশান থাকেন। স্বী সন্তান-সন্ততিদেরকে বিজাতীয় মডেলে গড়ে তুলতে তাঁরা থাকে সদা তৎপর। তাঁরা বিভিন্ন মাহফিলের মধ্যমণিরূপে আসীন হয়ে থাকেন। মাহফিল শেষে মোটা অংকের হাদীয়া তোহফা নিয়ে গাড়ি হাঁকিয়ে দেন উড়াল। হাদিয়ার টাকা একটু কম হলে সে-কি তুলকালাম কান্ডইনা ঘটিয়ে থাকে। প্রকৃত আলেমদের সম্পর্কে আল্লাহ্র রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেন:

হযরত ইবনে আববাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ্র রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেছেন- এ’ উম্মাতের আলেমরা দু’শ্রেণীতে বিভক্ত। প্রথম শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত হচ্ছেন সে আলেম যাকে আল্লাহ্ তাআলা ইলম দান করেছেন, আর সে তাঁর ইলম জনগণের মধ্যে ব্যয় করেছেন, লোভ-লালসার বশীভূত হয়ে মানুষের নিকট থেকে কোনরূপ বিনিময় গ্রহণ করেননি কিংবা তা বিক্রয়ও করেননি। সেই আলেমের জন্য জল ভাগের মৎস্যস্থল, স্থালভাগের সকল প্রাণী এবং মহাশূন্যে উড়ন্ত পক্ষীকুল তাঁর জন্য আল্লাহ্র দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর দ্বিতীয় শ্রেণীভূক্ত আলেম হচ্ছে, যাকে আল্লাহ ইলম দান করেছেন, কিন্তু সে আল্লাহ্র বান্দাদের সাথে (তার ইলম খরচ করার ব্যাপারে) কৃপণতা করেছে, লোভ-লালসার বশবর্তী হয়ে (ইলম খরচ করে কিংবা ইলম শিক্ষা দিয়ে) বিনিময় গ্রহণ করেছে এবং মূল্যের বিনিময়ে বিক্রয় করেছে। (তার শাস্তি হলো) কিয়ামত দিবসে তাকে আগুনের লাগাম দেয়া হবে এবং একজন আহবানকারী শব্দ করতে (বলতে) থাকবেন যে, ‘‘এ ব্যক্তি হচ্ছে ঐ আলেম, যাকে আল্লাহ্ তাআলা ইলম দান করেছিলেন কিন্তু সে আল্লাহ্র বান্দাহদের সাথে (ইলমের ব্যাপারে) কৃপণতা করেছে, লোভের তাড়নায় বিনিময় গ্রহণ করেছে এবং মূল্যের বিনিময়ে ইলম বিক্রয় করেছে।’’ আর এ’ভাবে হাশর ময়দানের বিচার কাজ সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত শব্দ করতে থাকবে।- তিবরানী।

উদ্ধৃত হাদীসের আলোকে প্রতীয়মান হয় যে, প্রথমোক্ত আলেমেরা হচ্ছেন সঠিক এবং প্রকৃত আলেম। বর্তমান সময়ে এ রকম সংখ্যা খুবই নগণ্য। এমনি কিন্তু সিরাতে- সুরাতে, আচারে-অনুষ্ঠানে সবাই তো আলেম। প্রকৃত আলেম বেছে নেয়া সত্যি মুশকিল। এ ক্ষেত্রে আল্লাহ্র রাসূলের হাদীস, বুযুর্গানে দ্বীন ও সালফে সালেহীনের মূল্যবান বাণীর আলোকে চিন্তা-গবেষণা করে আমাদেরকে প্রকৃত আলেমের পরিচয় জেনে নিতে হবে। আজকের এই সময়ের মেকী আলেম ও লোক দেখানো আবেদদের সম্পর্কে আল্লাহ্র রাসূল (সাঃ) এর একটি হাদীস তরীকায়ে মোহাম্মাদিয়া গ্রন্থে হযরত আনাস (রাঃ) এর বাচন ভঙ্গিতে এ’ভাবে উদ্ধৃত হয়েছে, হযরত আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, হুজুর (দঃ) ইরশাদ করেছেন যে, শেষ যামানায় (কিছু সংখ্যক) মূর্খ ইবাদতকারী এবং ফাসেক আলেম বের হবে।

এ সম্পর্কে হযরত মুজাদ্দেদ আলফে সানী মাকতুবাত গ্রন্থে লিখেছেন যে, জনৈক বুযুর্গ ব্যক্তি একবার অভিশপ্ত ইবলিসকে দেখতে পায় যে, সে একেবারে খোশ মেজাজে ও বেকার হয়ে বসে আছে। ঐ বুযুর্গ ব্যক্তি ইবলিসকে তার এহেন বেকার বসে থাকার কারণ জিজ্ঞেস করলে প্রত্যুত্তরে সে বলে যে, বর্তমান সময়ের আলেম সমাজ আমাদের কাজ সমাধা করছে, জনগণকে পথভ্রষ্ট করার জন্য তারাই যথেষ্ট।

তিনি তার মাকতুবাত গ্রন্থে আরো লিখেছেন যে, মন্দ আলেমরা হচ্ছেন দ্বীনের জন্য ডাকাত স্বরূপ। তাদের উদ্দেশ্য পার্থিব মর্যাদার প্রতি আসক্তি এবং নেতৃত্বর প্রতি লোভ। তারা জনগণের সামনে নিজেদেরকে জাহির করতে ভালবাসে।

উপরোক্ত বক্তব্যের প্রতি গভীরভাবে মনোনিবেশ করে চিন্তা গবেষণা করলে প্রকৃত আলেমের পরিচয় জানতে খুব একটা কষ্ট হয়না। যাঁরা প্রকৃত আলেম, তাঁদের মর্যাদা মহান আল্লাহ্র দরবারে অতি উচ্চে। তাঁদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ তাআলা ঘোষণা করেছেন,

‘‘ইন্নামা ইয়াখশাল্লাহা মিন ইবাদিহিল উলামাউ’’

অর্থ : ‘আল্লাহ্র বান্দাহদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে’’ – সূরা ফাতির-২৮

এখানে ‘ওলামা’ বলতে এমন লোকদেরকে বুঝানো হয়েছে, যাঁরা মহান আল্লাহ্র সত্তা ও গুণাবলী সম্পর্কে সম্যক ভাবে অবগত এবং বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টিকুল, তার আবর্তন-বিবর্তন, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন সম্পর্কে চিন্তা গবেষণা করেন। সৃষ্টি বৈচিত্র্য সম্পর্কে, দিবা-রাতের হ্রাস বৃদ্ধি নিয়ে চিন্তা করেন। কেবল নাহু-ছরফ, ফিকাহ, অলংকার শাস্ত্র কিংবা বিশুদ্ধ আরবী ফার্সী জানা ব্যক্তিদেরকে এখানে ওলামা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।

মোট কথা আল্লাহ্র পছন্দনীয় বস্ত্তকে যাঁরা ভালবাসেন, আল্লাহ্র অপছন্দনীয় বস্ত্তকে যাঁরা বর্জন করেন, শিরক, বিদায়াত, রিয়া, খোদপছন্দী হতে যারা নিজেদেরকে দূরে রাখেন, তাঁরাই হচ্ছেন প্রকৃত আলেম। যার মধ্যে আল্লাহ্র ভয় নেই, হালাল-হারামের তারতম্য নেই, শত আরবী জানলেও কোরানের পরিভাষায় তাকে আলেম বলা হয়নি।

প্রকৃত ইলেম হচ্ছে যা কলবকে নূরান্বিত করে। যে ইলম দ্বারা কলব প্রদীপ্ত হয়না তা’ প্রকৃত ইলেম হতে পারেনা। এ সম্পর্কে হযরত হাছান বসরী (রাঃ) বলেন, ইলেম দু’প্রকার। একটি হচ্ছে যা কলব তথা অন্তর জগতে প্রোথিত। আর এ ইলমই দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দানকারী। দ্বিতীয়টি হচ্ছে যা মানুষের জবানের মধ্যে প্রদেয়। আর এটাই হচ্ছে আদম সন্তানের উপর দলীল। (এটার উপর মহান আল্লাহ তাআলা অভিযোগ উপস্থাপন করে বলবেন, আমি তোমাকে ইলম দান করেছিলাম, তদনুযায়ী তুমি আমল করনি কেন?) মিশকাত। এ হাদীসের আলোকে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, যে ইলম অন্তরকে নূরান্বিত করে, তাই প্রকৃত ইলেম। আর যাঁরা এরূপ ইলমের অধিকারী তাঁরাই হচ্ছেন প্রকৃত আলেম এবং তাঁরাই হচ্ছেন হযরত আম্বিয়া (আঃ) এর উত্তরাধিকারী।

হযরত শেখ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী (রাহ.) বলেছেন, উহাই কল্যাণমূলক ইলম, যা অন্তর্জগতে তার আলো বিস্তার করে এবং উহার দ্বারা অন্তরের আবরণসমূহ বিদূরীত হয়। আর কল্যাণমূলক ইলম দু’প্রকার। এক, ইলমে মুয়ামালা, যা আমলের কারণ হয়। দুই, ইলমে ‘মুকাশাফা’ যা হচ্ছে আমলের ফল এবং নিদর্শন। মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদেরকে ইচ্ছা করেন তাঁদের মধ্যে এ আলোক রশ্মি প্রদীপ্ত করে দেন। আর মৌখিক ইলম হচ্ছে যার কোন তা’ছীর নেই।

মোল্লা আলী কারী বলেন যে, ইলমে নাফে বা কল্যাণমূলক ইলেম হচ্ছে ইলমে ‘বাতেন’ আর ‘ইলমুল আলাল-লিছান’’ বা মৌখিক ইলম হচ্ছে ইলমে জাহির। কিন্তু বাহ্যিক বা ইলমে জাহিরের বিশুদ্ধতা ব্যতীত ইলমে বাতেন লাভ করা মুশকিল। অনুরূপ ভাবে ‘বাতিন’ এর ইসলাহ ব্যতীত ইলমে জাহির ও পরিপূর্ণ ভাবে লাভ করা অসম্ভব। একটা আরেকটার পরিপূরক। আর এ জন্যই ইমাম মালেক (রাহ.) বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি ফিকাহ শাস্ত্রের ইলম হাসিল করেছেন কিন্তু তাসাওফ হাসিল করেননি, তিনি হচ্ছেন ‘ফাসেক’। আর যে ব্যক্তি কেবল তাসাওফ বিদ্যা লাভ করেছে, কিন্তু ফিকাহ শাস্ত্রের বিদ্যা অর্জন করেনি, সে হচ্ছে যিন্দিক। আর যে ব্যক্তি উভয় প্রকার (ফিকাহ ও তাসাওফ) ইলেম উপার্জন করেছেন, তিনি হচ্ছেন মুহাক্কিক বা পরিপূর্ণ ও প্রকৃত আলেম।

আবু তালিব মাক্কী বলেছেন, ‘‘ইলমে জাহির ও ইলমে বাতিন উভয়টাই হচ্ছে প্রকৃত ইলম। একটা আরেকটা হতে পৃথক নয়। যেমনি ভাবে ঈমান আর ইসলাম পরস্পর এরূপ সম্পৃক্ত, যে রূপ দেহ আর কলব সম্পৃক্ত।

মোট কথা জাহেরী ইলম হচ্ছে দুধের মতো, আর বাতেনী ইলম হচ্ছে ননীর মতো। দুধ ছাড়া যেমনি ভাবে ‘ননী’ কল্পনা করা যায় না, তেমনি ভাবে জাহেরী ইলম ছাড়া বাতেনী ইসলাহও অকল্পনীয়। আজকের এ সময়ে যা প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে, তা কেবল সুরত আর পোশাকের মধ্যেই প্রায় সীমিত। ইলমে জাহেরে পান্ডিত্য অর্জনকারী দেখা গেলেও তাদের অন্তরাত্মা আল্লাহভীতি শূন্য ও লোভ-লালসায় পরিপূর্ণ বলেই মনে হয়। অথচ এ’হেন ব্যক্তিরাই নিজেদেরকে বড় আলেম বলে জাহির করে। আমরাও তাদেরকে আলেম হিসেবে মান্য করি।

লেখক : প্রঃ মিল্লাত লাইব্রেরী, লাঙ্গলকোর্ট বাজার, কুমিল্লা। মোবা: ০১৮১২-৮৭৭৬৩৫

0 comments:

Post a Comment